কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের এই যুগে এসে শুধু ভালো রেজাল্ট বা নামিদামি ডিগ্রির যে খুব একটা দাম নেই, সেটা আস্তে আস্তে বেশ পরিষ্কার হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথাই ধরা যাক। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং আর গণিত—যাকে আমরা স্টেম (STEM) বলি—এসব ক্ষেত্রে কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা আর কর্পোরেট গবেষণার মান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু কিউএস (QS)-এর সদ্য প্রকাশিত একটা সূচক বলছে ভিন্ন কথা। গ্লোবাল প্রতিযোগীদের তুলনায় এআই যুগের শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে কোরিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিশাল একটা ফারাক তৈরি হয়েছে।
কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৭-এ দক্ষিণ কোরিয়া ৯৩.৪ স্কোর নিয়ে বিশ্বজুড়ে ষষ্ঠ স্থানে আছে ঠিকই (যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও কানাডার ঠিক পেছনেই)। দক্ষতা সমন্বয় আর অর্থনৈতিক রূপান্তরে তারা যথাক্রমে পঞ্চম ও চতুর্থ। কিন্তু ধাক্কাটা খেয়েছে ‘ফিউচার অব ওয়ার্ক’ বা ভবিষ্যতের কাজের ধরনে—সেখানে তারা ১৫তম। কিউএস-এর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাত্তেও কোয়াকোয়ারেল্লির মতে, এই সূচকটা তৈরিই করা হয়েছে এটা দেখার জন্য যে, শিক্ষাব্যবস্থা আর শ্রমবাজার নতুন প্রযুক্তির সাথে কতটা দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারছে। উদ্ভাবন আর গবেষণায় এত এগিয়ে থাকার পরও এআই-চালিত শ্রমবাজারের জন্য কোরিয়া মোটেও প্রস্তুত নয়। কিউএস কোরিয়াকে বলছে ‘ফিউচার স্কিলস প্যারাডক্স’।
কাঠামোগত বাধা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতা সেমিকন্ডাক্টর, এআই, বায়োটেক বা অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে তাদের একটা শক্ত ইকোসিস্টেম আছে, কিন্তু এআই স্কিল পেনিট্রেশনের দিক থেকে তারা বিশ্বে ৩৬তম। সাধারণ কর্মীবাহিনীর মধ্যে এআই দক্ষতার বিস্তার না ঘটাটাই এর বড় কারণ। সাথে কিছু কাঠামোগত সমস্যাও আছে। একদিকে জনসংখ্যা কমছে, যার প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর। অন্যদিকে, দেশের শ্রমবাজার অদ্ভুতভাবে বিভক্ত। গ্র্যাজুয়েটরা হয় ‘চেবল’ (chaebol) বা বড় বড় কর্পোরেটগুলোর চাকরির পেছনে ছুটছে, নয়তো অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কাজে আটকে পড়ছে। সাথে আছে শুধু ডিগ্রির পেছনে ছোটার একটা তীব্র সামাজিক সংস্কৃতি। সরকার গ্লোকাল/রাইজ (Glocal/RISE) সংস্কারের মাধ্যমে সিউলকেন্দ্রিক এই ডিগ্রির অহংকার ভাঙার চেষ্টা করলেও, অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ভবিষ্যতের উপযোগী কর্মীবাহিনীতে রূপান্তর করতে হলে তাদের স্কিল আর একাডেমিক ভিত্তি আরও মজবুত করতে হবে। শুধু ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেই যে বাজার ধরে রাখা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
স্কুলের সিলেবাসেই যখন এআই ঠিক এই জায়গাটাতেই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাটা জরুরি হয়ে পড়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা হয়তো সেই পথটাই দেখাচ্ছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর সোশ্যাল মিডিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে একটা বিল (হাউস বিল ৩০১) টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনার পর সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়ার পথে। বিলটার মূল উদ্দেশ্য হলো স্কুলগুলোতে এআই শিক্ষার স্ট্যান্ডার্ড একেবারে খোলনলচে বদলে ফেলা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্যও এআই শিক্ষার নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কম্পিউটার সায়েন্সের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
কম্পিউটার সায়েন্সের মতো বিষয়ে এআইয়ের প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, মাইক্রোসফট বা অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টরা এখন কোডিং বা ডিবাগিংয়ের জন্য বট ব্যবহার করছে, আর চাকরি হারাচ্ছে মানুষ। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ডেটা বলছে, কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের হার এখন প্রায় ৭%, আর কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সেটা ৭.৮%। এটা রীতিমতো ভাবনার বিষয়।
নর্থ ক্যারোলিনার আইনপ্রণেতারা এই বাস্তবতাটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন। তারা চাইছেন ২০২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষ থেকেই কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি (K-12) পর্যন্ত কম্পিউটার সায়েন্সের সিলেবাসে ‘এআই লিটারেসি’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক করতে। এই আইন পাস হলে ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন (DPI) এনসি স্টেট ইউনিভার্সিটির সাথে মিলে শিক্ষক আর প্রশাসকদের ট্রেনিং দেবে।
নীতিমালা, প্রয়োগ ও বাস্তবতার টানাপোড়েন নতুন এই সিলেবাসে শুধু কোডিং শেখানো হবে না; এআই টুলের সীমাবদ্ধতা কী, এর আউটপুট কীভাবে যাচাই করতে হয়, ডেটা আর প্রাইভেসির ঝুঁকি কতটুকু—এইসব কিছুই থাকবে। এমনকি এআই চ্যাটবট ব্যবহারের এথিকস বা নৈতিক দিকগুলোও শেখানো হবে। স্কুলগুলোকে নিজেদের মতো করে এআই ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যেখানে ডিপিপিআই একটা ‘মডেল পলিসি’ ধরিয়ে দেবে।
তবে এসব বড় বড় উদ্যোগের একটা উল্টো পিঠও থাকে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর জয়েস ওয়াডেল যেমনটা মনে করিয়ে দিয়েছেন, স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোর ওপর বিশাল একটা দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়তি কোনো ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়নি। অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবার স্কুলে ফিরে আসছেন পড়াতে, তাদেরও এই নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। ফান্ডিং ছাড়া শুধু নির্দেশ দিয়ে এই বিশাল ট্রেনিং প্রোগ্রাম কতটা সফল হবে বা কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো যে কাঠামোগত সংকটে ভুগছে তা থেকে এরা কতটা বের হয়ে আসতে পারবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।