আমরা যখন চ্যাটজিপিটিতে কোনো প্রশ্ন করি, তখন কথার পেছনের মূল উদ্দেশ্যটা ধরতে পারাটাই একটা এআই-এর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ওপেনএআইয়ের নতুন জিপিটি-৫.৫ ইনস্ট্যান্ট (GPT-5.5 Instant) মডেল ঠিক এই জায়গাতেই বাজিমাত করেছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব এই এআই এখন শুধু আপনার কথার জবাবই দেয় না, বরং আলাপচারিতার কন্টেক্সট বা পূর্বাপর সংযোগ মনে রাখতে পারে দারুণভাবে। আপনি যদি বারবার শর্ত জুড়ে দেন বা উত্তরের পাল্টা যুক্তি দেখান, সে খেই হারিয়ে পুরোনো কথা আওড়ানোর বদলে নতুন তথ্যের সাথে মানিয়ে নেয় এবং আরও প্রাসঙ্গিক উত্তর দেয়।
গত মে মাসে ডিফল্ট হিসেবে যুক্ত হওয়া এই মডেলে ফ্যাকচুয়াল এরর বা ভুল তথ্যের হার কমেছে ৩৭.৩ শতাংশ, আর তথাকথিত ‘হ্যালুসিনেশন’ কমেছে ৫২.৫ শতাংশ। এমনকি ট্রাভেল করার সময় আপনি যদি কাছাকাছি ভালো কোনো রেস্তোরাঁর খোঁজ চান, এটি এখন লোকেশন কন্টেক্সট বুঝে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক আর গোছানো রেকমেন্ডেশন দিতে পারে। ওপেনএআইয়ের মতে, তাদের চ্যাটবটের রেসপন্সগুলো এখন আর আগের মতো ছাঁচে ফেলা বা টেমপ্লেট নির্ভর মনে হবে না, বরং পুরো কথোপকথনটা বেশ ন্যাচারাল লাগবে।
আইওএস ২৭-এ চ্যাটজিপিটির দাপট
এআইয়ের এই বুদ্ধিমত্তার আঁচ গিয়ে পড়েছে অ্যাপলের ইকোসিস্টেমেও। আইওএস ২৭ (iOS 27)-এর নতুন সিরি (Siri) অ্যাপে এখন বেশ পরিচিত চ্যাটবট ইন্টারফেস চলে এসেছে, যেখানে আপনি টেক্সটের পাশাপাশি ছবি বা ফাইলও অ্যাটাচ করতে পারবেন। ডিফল্টভাবে এতে নতুন সিরি এআই কাজ করলেও, ইউজারদের জন্য একটা দারুণ বিকল্প খোলা রাখা হয়েছে। ইনপুট ফিল্ডে একটু চেপে ধরে ‘Ask…’-এ ট্যাপ করলেই পপ-আপ মেনু থেকে আপনি সরাসরি চ্যাটজিপিটিতে সুইচ করতে পারবেন।
তবে এখানে একটা ছোট ঘাপলা আছে। সিরি আর চ্যাটজিপিটি—এই দুজনের মধ্যে কন্টেক্সট বা কথার কোনো আদান-প্রদান হয় না। অর্থাৎ, সিরিকে যা বলেছেন চ্যাটজিপিটি সেটা জানবে না, আবার অ্যাপ বন্ধ করে খুললে রানিং কনভারসেশন থাকা সত্ত্বেও চ্যাটজিপিটির বদলে অ্যাপটি নিজে থেকেই আবার সিরিতে ফিরে যাবে। এটা আইওএস ২৭ বেটা-র কোনো বাগ নাকি অ্যাপলের ইচ্ছাকৃত ডিজাইন, সেটা নিয়ে অবশ্য ধোঁয়াশা আছে। তবে সেটিংস থেকে এক্সটেনশন অন করা থাকুক বা না থাকুক, সিরি অ্যাপে চ্যাটজিপিটি এখন বেশ শক্তপোক্ত একটা অল্টারনেটিভ। অ্যাপল হয়তো ভবিষ্যতে চ্যাটজিপিটিকে ডিফল্ট করার অপশন বা অন্য কোনো চ্যাটবটও যুক্ত করতে পারে।
বিজ্ঞাপনের প্রাসঙ্গিকতা এবং নতুন আয়ের উৎস
আর ঠিক এখানেই ওপেনএআই-এর ব্যবসার আসল খেলাটা শুরু হয়েছে। যখন একটা চ্যাটবট ইউজারের উদ্দেশ্য বা ‘ইউজার ইনটেন্ট’ এত নিখুঁতভাবে বুঝতে পারে, তখন সেটাকে কাজে লাগিয়ে আয় করার রাস্তাটাও পরিষ্কার হয়ে যায়। সাবস্ক্রিপশন আর এন্টারপ্রাইজ ডিলের বাইরে ওপেনএআই এখন তাদের বিজ্ঞাপন মডেলেও দারুণ মোমেন্টাম পাচ্ছে।
ওপেনএআই-এর চিফ রেভিনিউ অফিসার ডেনিস ড্রেসার জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে চ্যাটজিপিটিতে দেখানো বিজ্ঞাপনগুলো ইউজারদের ডিসমিস বা স্কিপ করার হার প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এর মানে হলো, মানুষ এখন এই অ্যাডগুলোকে বিরক্তির চোখে দেখছে না। সাধারণ ওয়েবসাইটের ডিসপ্লে অ্যাডের চেয়ে এআইয়ের ভেতরের বিজ্ঞাপনগুলো বেশ আলাদা। এখানে মানুষ আসে নির্দিষ্ট কোনো কাজ করতে বা সমস্যার সমাধান খুঁজতে। এই হাই-ইনটেন্ট মুহূর্তে যদি উল্টোপাল্টা বিজ্ঞাপন দেখানো হয়, তাহলে ইউজারের ট্রাস্ট নষ্ট হতে বাধ্য। কিন্তু জিপিটি-৫.৫ এর উন্নত কন্টেক্সট বোঝার ক্ষমতার কারণে বিজ্ঞাপনগুলো এখন ইউজারের কাজের সাথে অনেক বেশি মানানসই হচ্ছে।
ডেনিস ড্রেসারের মতে, তাদের মূল ফোকাসটাই হলো ‘ইউজফুলনেস’ বা উপযোগিতা। জোর করে ইউজারের মনোযোগ কাড়ার বদলে, তাদের চলমান কথোপকথনের সাথে প্রাসঙ্গিক এবং দরকারি রেকমেন্ডেশন দিতে পারলেই কনজ্যুমার এবং ব্র্যান্ড—উভয় পক্ষেরই লাভ। চ্যাটজিপিটির এই ডেটা অন্তত সেটাই প্রমাণ করছে যে, জেনারেটিভ এআই প্ল্যাটফর্মের ভেতরে বিজ্ঞাপনের ভবিষ্যৎ মূলত ইউজারের ইনটেন্ট বা উদ্দেশ্যের সাথে কতটা ভালোভাবে মিশে যেতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করবে।