স্মার্টফোন যুগের শুরুর দিকের কথা। তখন আইফোন আপগ্রেড করার ব্যাপারটা ছিল অনেকটা রুটিন মাফিক। প্রতি দুই বছর অন্তর মানুষ তাদের পুরোনো ফোন পালটে নতুন মডেল নিত। ক্যারিয়ারগুলোর সাবসিডি বা চুক্তির কারণে অনেক সময় নতুন আইফোন প্রায় ফ্রিতেই মিলে যেত! এখন শুনলে হয়তো রূপকথার মতো লাগবে, কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের দিকে এটাই ছিল স্বাভাবিক চিত্র।
তখনকার এই দুই বছরের আপগ্রেড সাইকেলটা বেশ যৌক্তিকও ছিল। অ্যাপল তখন পাগলের মতো হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যারে নতুন নতুন ফিচার আনছে। টাচ আইডি বা ফেস আইডির মতো চমকপ্রদ প্রযুক্তির স্বাদ পেতে হলে আইফোন ৫এস বা আইফোন এক্স-এ আপগ্রেড করা ছাড়া ব্যবহারকারীদের কাছে অন্য কোনো উপায় ছিল না। তাছাড়া কয়েক বছর গেলেই পুরোনো ফোনগুলো কেমন যেন ধীরগতির হয়ে পড়ত।
আপগ্রেড অভ্যাসের বদল
গত এক দশকে এই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। দীর্ঘদিনের আইফোন ব্যবহারকারীদের আপগ্রেড ইতিহাস ঘাঁটলেই এই পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়। আগে যেখানে সামান্য আপডেটের জন্যও মানুষ ফোন পালটে ফেলত—বিশেষ করে নতুন আইওএস (iOS) রিলিজ হলে পুরোনো ফোন যখন আর টানতে পারত না—এখন সেই প্রবণতা নেই বললেই চলে।
যেমন ধরুন, ২০১৬ সালের আইফোন এসই (iPhone SE) থেকে তিন বছর পর আইফোন ১১ প্রো-তে (iPhone 11 Pro) আপগ্রেড করাটা সেসময় বেশ সাধারণ ছিল। কিন্তু সেই ২০১৯ সালের আইফোন ১১ প্রো অনায়াসে পার করে দিচ্ছে বছরের পর বছর। অনেকেই সেটি একটানা ছয় বছর ব্যবহার করে হয়তো ২০২৫ সালে এসে আইফোন ১৭ (iPhone 17) হাতে তুলে নিচ্ছেন। অর্থাৎ, আপগ্রেডের বিরতি দুই বছর থেকে বেড়ে তিন, আর এখন সোজা ছয় বছরে গিয়ে ঠেকেছে!
রেডিট-এর মতো প্ল্যাটফর্মের আলোচনাগুলোও একই কথা বলছে। বর্তমানের স্বাভাবিক চিত্র হলো, বেশিরভাগ ব্যবহারকারী এখন ৩ থেকে ৪ বছর অনায়াসেই একটা আইফোন ব্যবহার করছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই ৩-৪ বছর পর যারা ফোন বদলাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই ফোন একদম ঠিকঠাক চলত। মূলত চার্জিং পোর্টের সমস্যা বা স্ক্রিন ফেটে যাওয়ার মতো ঝামেলার কারণেই তারা বাধ্য হয়ে নতুন ফোন কেনেন। কেউ কেউ তো ৮ বছর পর্যন্তও একটা আইফোন টেনে নিয়ে গেছেন, যদিও সেটা একেবারেই ব্যতিক্রম। অন্যদিকে, পুরো একটা নতুন ফোনের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা না ঢেলে, সামান্য কিছু টাকা খরচ করে শুধু ব্যাটারি পাল্টেই অনেকে পুরোনো আইফোনকে নতুন জীবন দিচ্ছেন।
ব্যবসা বনাম সফটওয়্যার সাপোর্ট
অনেক বাজার বিশ্লেষক ভেবেছিলেন, মানুষ যদি এত লম্বা সময় একটা ফোন ব্যবহার করে, তবে অ্যাপলের ব্যবসায় লাল বাতি জ্বলবে। কিন্তু বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও ঘটেনি। ম্যাকরিউমার্সের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকে (Q2) অ্যাপল ১১১.২ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রাজস্ব আয় করেছে।
এই পুরোনো ফোনগুলো বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখার পেছনের আসল কারিগর হলো অ্যাপলের সফটওয়্যার সাপোর্ট। ডাব্লিউডাব্লিউডিসি (WWDC) ইভেন্টে অ্যাপলের দেওয়া তথ্যমতে, এই বছরের শেষের দিকে আইওএস ২৭ (iOS 27) রিলিজ হলে ২০১৯ সালের সেই পুরোনো আইফোন ১১-ও আগের চেয়ে অনেক বেশি রেসপন্সিভ মনে হবে। মূলত অপারেটিং সিস্টেমের কোর জায়গায়, বিশেষ করে সিপিইউ শিডিউলারের (CPU scheduler) মতো কম্পোনেন্টে কিছু অপটিমাইজেশনের কারণেই এটা সম্ভব হচ্ছে। এই অ্যালগরিদমগুলো ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ এবং সার্ভিসের ট্রাফিক এমনভাবে ম্যানেজ করে যাতে আপনি যে কাজটা করছেন সেটা একদম স্মুথলি চলে।
নতুন এই আপডেটের ফলে বেশ কিছু পারফরম্যান্স বুস্ট চোখে পড়বে:
-
অ্যাপ লঞ্চিং: আইফোন ১১ প্রো ম্যাক্সে অ্যাপ খোলার গতি বাড়বে প্রায় ৩০ শতাংশ।
-
ফাইল ট্রান্সফার: আইফোন ১৬ প্লাসে এয়ারড্রপ (AirDrop) ফাইল ট্রান্সফার হবে ৮০ শতাংশ দ্রুত।
-
ফটো লাইব্রেরি: আইফোন ১৫-তে ছবি তোলার পর ফটো লাইব্রেরিতে ঢোকার গতি বাড়বে প্রায় ৭০ শতাংশ।
এর পাশাপাশি, ওয়াই-ফাই এবং সেলুলার নেটওয়ার্কের মধ্যে সুইচিং আরও স্মার্ট হবে। স্পটলাইট (Spotlight), ফটোস এবং মেইলের সার্চ ইঞ্জিন একেবারে নতুন করে সাজানো হয়েছে, ফলে একবার খুঁজলেই দরকারি জিনিসটা চোখের সামনে চলে আসবে।
ইকোসিস্টেমের ফাঁদ এবং আসল উদ্দেশ্য
পুরোনো ফোনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এই কৌশলটা আসলে অ্যাপলের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক চাল। মার্কেট রিসার্চ প্রতিষ্ঠান আইডিসি-র (IDC) ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো-র মতে, এই জায়গাতেই আইওএস আর অ্যান্ড্রয়েডের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা তৈরি হয়। একজন গ্রাহক যখন জানেন যে তার আইফোনটা অনেক দিন টিকবে এবং বিক্রি করার সময় ভালো রিসেল ভ্যালু পাওয়া যাবে, তখন তিনি স্বভাবতই এর প্রতি আকৃষ্ট হন। গুগল বা স্যামসাংয়ের মতো হাতেগোনা কয়েকটি ব্র্যান্ড ছাড়া বেশিরভাগ অ্যান্ড্রয়েড ফোন দুই-তিন বছর পরই আর কোনো আপডেট পায় না, আর তাদের রিসেল ভ্যালুও ধপাস করে পড়ে যায়।
অ্যাপল খুব ভালো করেই জানে, মানুষ যখন একটা আইফোন বেশি দিন ব্যবহার করে, তখন অ্যাপল ইকোসিস্টেমের অন্য প্রোডাক্টগুলোর (যেমন- অ্যাপল ওয়াচ বা এয়ারপডস) প্রতি তাদের ঝোঁক বাড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সার্ভিসেস খাত। ফিটনেস+, অ্যাপল টিভি, অ্যাপল মিউজিকের মতো সার্ভিসগুলো থেকে অ্যাপল এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামাচ্ছে। শুধু এপ্রিলেই তাদের সার্ভিসেস খাত থেকে রেকর্ড ৩১ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। সুতরাং, আইফোন ১১-কে সাপোর্ট দেওয়াটা অ্যাপলের জন্য শুধু গ্রাহকসেবা নয়, এটা ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং ইকোসিস্টেম ধরে রাখার মোক্ষম এক হাতিয়ার।
তবে এখানে একটা বড়সড় ‘কিন্তু’ আছে। পুরোনো আইফোনগুলো আপডেট পেলেও নতুন সফটওয়্যারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফিচারগুলো কিন্তু তারা পাবে না। আইওএস ২৭-এ আসতে যাওয়া ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’ (Apple Intelligence) বা নতুন এআই-চালিত সিরি-র (Siri AI) আসল মজা নিতে হলে আপনার হাতে অন্তত আইফোন ১৫ প্রো (iPhone 15 Pro) বা তার চেয়ে নতুন কোনো মডেল থাকতে হবে। তাই আপনি যদি এআই দিয়ে ছবি এডিট করতে চান বা আপনার ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টকে সত্যিকার অর্থে কাজে লাগাতে চান, তবে পুরোনো ফোন আঁকড়ে ধরে বসে থাকলে চলবে না, শেষমেশ আপনাকে ওই আপগ্রেডের পথেই হাঁটতে হবে।