অ্যাপল এখন আর শুধু প্রিমিয়াম গ্যাজেট বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তারা মানুষের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর দিকে রীতিমতো আটঘাট বেঁধে নেমেছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’-এর সাহায্যে সফটওয়্যার লেভেলে অভাবনীয় সব ফিচার যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে হার্ডওয়্যারেও আসতে যাচ্ছে বড়সড় পরিবর্তন।
সম্প্রতি অ্যাপল তাদের অ্যাক্সেসিবিলিটি ফিচারে বেশ কিছু বড় আপডেটের প্রিভিউ প্রকাশ করেছে, যা মূলত প্রতিদিনের ব্যবহারে নির্ভরশীল ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা ক্ষীণদৃষ্টির মানুষদের জন্য ভয়েসওভার এবং ম্যাগনিফায়ার টুলের সক্ষমতা আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়ানো হচ্ছে। আগে যেখানে শুধু স্ক্রিনের সাধারণ বর্ণনা পাওয়া যেত, এখন অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের ইমেজ এক্সপ্লোরার ব্যবহার করে যেকোনো ছবি, স্ক্যান করা বিল বা ব্যক্তিগত নথিপত্রের একদম খুঁটিনাটি তথ্য জানা যাবে। আইফোনের অ্যাকশন বাটন চেপে সরাসরি ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে থাকা দৃশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা যাবে, এমনকি নিজের মতো করে পাল্টা প্রশ্ন করে আরও বিশদ ভিজ্যুয়াল তথ্য জানার সুযোগ থাকছে এখানে।
ভয়েস কন্ট্রোলের ক্ষেত্রেও এসেছে দারুণ এক স্বস্তি। এখন আর স্ক্রিনে থাকা নির্দিষ্ট কোনো বোতাম বা লেবেলের নাম কষ্ট করে মুখস্থ রাখতে হবে না। ব্যবহারকারীরা চাইলে একদম সাধারণ কথ্য ভাষায় কমান্ড দিতে পারবেন। যেমন আপনি হয়তো বললেন “বেস্ট রেস্টুরেন্টের গাইডটাতে ট্যাপ করো” বা “বেগুনি ফোল্ডারটা খোলো”, আর ফোন ঠিক সেটাই করবে। অ্যাপল ম্যাপস বা ফাইলসের মতো ভিজ্যুয়াল লেআউট আছে এমন অ্যাপগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করার জন্য এই “যাই দেখছেন তাই বলুন” ধরনের ইনপুট মেকানিজম বেশ কাজের।
পড়াশোনা বা আর্টিকেল পড়ার সুবিধার্থে অ্যাক্সেসিবিলিটি রিডার আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত হয়েছে। এখন এটি বিজ্ঞানভিত্তিক জটিল প্রবন্ধ, একাধিক কলাম, ছবি বা টেবিল সহজেই প্রসেস করতে পারে। চাইলে পুরো আর্টিকেলের ভেতরে ঢোকার আগেই একটা সারমর্ম পড়ে নেওয়ার অপশন থাকছে। সাথে থাকা বিল্ট-ইন ট্রান্সলেশনের সাহায্যে কাস্টম ফন্ট বা ফরম্যাটিং ঠিক রেখেই মাতৃভাষায় টেক্সট পড়ার সুবিধাটা বেশ দারুণ।
ভিজ্যুয়াল ফিচারের বাইরেও অ্যাপল ভিশন প্রো ব্যবহারকারীদের জন্য চোখের ইশারায় পাওয়ার হুইলচেয়ার নিয়ন্ত্রণের মতো ফিউচারিস্টিক ফিচার আসতে যাচ্ছে এ বছরের শেষ দিকেই। এর সাথে থাকছে আনক্যাপশনড ভিডিও কন্টেন্টের জন্য অন-ডিভাইস সাবটাইটেল জেনারেশন এবং তিনটি উজ্জ্বল নতুন রঙে ম্যাগসেইফ নির্ভর অ্যাক্সেসিবিলিটি-বান্ধব হিকাওয়া গ্রিপ অ্যান্ড স্ট্যান্ড। অ্যাপলের সিইও টিম কুকের ভাষায়, প্রাইভেসির মূল জায়গাটা ঠিক রেখেই তারা অ্যাক্সেসিবিলিটিতে শক্তিশালী সব সক্ষমতা যুক্ত করছেন। অ্যাপলের গ্লোবাল অ্যাক্সেসিবিলিটি পলিসির সিনিয়র ডিরেক্টর সারাহ হেরলিঞ্জারের কথাতেও একই সুর পাওয়া যায়, যেখানে তিনি ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি ইনপুট ও পার্সোনালাইজেশনের নতুন দিকের কথা তুলে ধরেছেন।
সফটওয়্যারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি অ্যাপল তাদের পরিধানযোগ্য ডিভাইসগুলোকেও আক্ষরিক অর্থেই মেডিকেল ডিভাইসের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ডিজিটাইমসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দিকে অ্যাপল ওয়াচে সরাসরি রক্তচাপ মাপার প্রযুক্তি আসতে পারে, যা সম্ভবত অ্যাপল ওয়াচ আল্ট্রা ৪-এর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করবে। বর্তমানে এই সেন্সিং প্রযুক্তিটি ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) পর্যালোচনার অধীনে আছে।
অনেকের মনে হতে পারে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াচওএস ২৬ এর সাথে তো উচ্চ রক্তচাপের নোটিফিকেশন ফিচার এমনিতেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐ ফিচারটি মূলত মেশিন লার্নিং ও হার্ট সেন্সরের ডেটা বিশ্লেষণ করে ৩০ দিনের একটা ট্রেন্ড থেকে শুধু প্রাথমিক সতর্কতা দেওয়ার কাজ করে। ওটা কোনো প্রপার ডায়াগনস্টিক টুল নয়। তবে নতুন যে সেন্সরটি নিয়ে কাজ চলছে, সেটি একদম নিখুঁতভাবে রক্তচাপ মাপতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্মার্টওয়াচের দুনিয়ায় সরাসরি ব্লাড প্রেসার মাপার ঘটনা এটাই প্রথম হতে পারে। আর এই আপগ্রেডের সাথে সাথে আল্ট্রা সিরিজের ডিজাইনেও বড়সড় পরিবর্তন আসার জোর গুঞ্জন রয়েছে। সত্যিই যদি এমনটা হয়, তবে সিরিজ ৯-এর পর এটিই হবে অ্যাপল ওয়াচের সবচেয়ে বড় হেলথ সেন্সর আপগ্রেড।
এই পুরো ব্যাপারটি হেলথ টেকনোলজি নিয়ে অ্যাপলের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যেরই একটা অংশ। কারণ রক্ত না টেনেই নন-ইনভেসিভ পদ্ধতিতে গ্লুকোজ মাপার প্রযুক্তি নিয়েও তাদের কাজ করার কানাঘুষা রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চের দিকে এমন একটা খবরও শোনা গিয়েছিল যে, অ্যাপল তাদের পরিধানযোগ্য ডিভাইসে ক্যামেরা যুক্ত করার উপায় খুঁজছে, যা তাদের এই ভিজ্যুয়াল ইন্টেলিজেন্স ফিচারের সাথে মিলে একেবারে নতুন কোনো ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারে। এফডিএ-এর ছাড়পত্র কত দ্রুত পাওয়া যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ সালের এই ব্লাড প্রেসার ফিচারটি আলোর মুখ দেখবে কি না। তবে এআই আর নতুন সেন্সরের এই মিশ্রণ হোম হেলথ মনিটরিংয়ের সংজ্ঞাই হয়তো বদলে দিতে যাচ্ছে, আর স্মার্টওয়াচ পরিণত হতে যাচ্ছে স্রেফ গ্যাজেট থেকে একটা লাইফ-সেভিং টুলে।