গুয়াহাটির মাঠে চেন্নাই সুপার কিংসের জন্য দিনটা ছিল একেবারে ভুলে যাওয়ার মতো। টস থেকে শুরু করে ম্যাচের শেষ বল—কোথাও সিএসকে-র কোনো দাপট চোখে পড়েনি। তাদের অনভিজ্ঞ মিডল অর্ডারের কঙ্কাল শুরুতেই বেরিয়ে পড়েছিল, জেমি ওভারটন ছাড়া আর কেউই সেভাবে ক্রিজে দাঁড়াতে পারেননি। বোলিংয়ে ধার ছিল না, ফিল্ডিংও বেশ ছন্নছাড়া। অন্যদিকে রাজস্থান রয়্যালসের চিত্রনাট্যটা যেন নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল। বোলাররা মঞ্চটা তৈরি করে দিয়েছিলেন, আর রান তাড়া করতে নেমে তরুণ বৈভব সূর্যবংশী যা করলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।
এই বৈভবকে নিয়ে কিন্তু কিছুদিন ধরেই ক্রিকেটপাড়ায় বেশ চর্চা চলছে। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার এক অদ্ভুত ইনিংস নিয়ে বেশ শোরগোল পড়েছিল। ওই ম্যাচে সুপার সিক্সে ভারতের সেমিফাইনালে ওঠার সমীকরণ ছিল। বৈভব মাত্র ৩০ রান করে আউট হলেও, তার ইনিংসে ছিল ৫টি চার ও একটি ছক্কা। তবে সবচেয়ে নাটকীয় ব্যাপার ছিল তার আউট হওয়ার ধরনটা। অষ্টম ওভারের শেষ বলে আউট হওয়ার ঠিক আগের বলেই সে দু-দু’বার জীবন পেয়েছিল! মহম্মদ সায়ামের শর্ট বল অফস্টাম্পের বাইরে থেকে হুক করতে গিয়ে ঠিকমতো টাইমিং করতে পারেনি বৈভব। বল ব্যাটের কানায় লেগে স্কয়ার লেগে উঠলেও হুজাইফা আহসান ক্যাচ ফসকান। শুধু তাই নয়, ক্যাচ ছেড়ে হুজাইফা বল থ্রো করলেও ফিল্ডাররা তা ধরতে ব্যর্থ হয়, অথচ বৈভব তখন পিচের মাঝখানে! একই বলে ক্যাচ ও রান আউটের হাত থেকে বেঁচেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি তার। পরের বলেই সায়ামের বলে পুল করতে গিয়ে উইকেটরক্ষক হামজা জাহুর হাতে ধরা পড়ে সে। যদিও পাকিস্তান ম্যাচে বৈভবদের নেট রানরেট ভালো থাকায় ভারতের সামনে একটা স্বস্তির জায়গা ছিল।
বিশ্বকাপের সেই উত্থান-পতনের পর আইপিএলে এসে বৈভব যেন নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়েছেন। রাজস্থানের অধিনায়ক রিয়ান পরাগ এই তরুণকে নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। ম্যাচ শেষে রিয়ান বলছিলেন, “আমি ওকে পরিষ্কার বলে দিয়েছি, তুমি ১৪টা ম্যাচ খেলবে এবং বাইরের সমালোচনা নিয়ে একদম মাথা ঘামাবে না। ও স্বাধীনভাবে ব্যাট করতে ভালোবাসে, আর আমি কোচদের বলেছি ওকে যেন পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়। আজ ও যেভাবে ব্যাট করল, আমি আর ধ্রুব (জুরেল) তো ডাগআউটে বসে জাস্ট অবাক হয়ে দেখছিলাম যে ছেলেটা করছে কী!” রিয়ানের কথায় দলের নতুন রসায়নটাও বেশ স্পষ্ট। পুরো সময়ের অধিনায়ক হিসেবে এমন জয় পেয়ে তিনি খুশি। বিশেষ করে গুয়াহাটির স্যাঁতসেঁতে লাল মাটির পিচে জোফ্রা আর্চার, সন্দীপ শর্মা, জাদেজা এবং তরুণ ব্রিজেশরা যেভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন, তার প্রশংসা করেছেন রিয়ান।
ম্যাচের সেরা হয়েছেন নান্দ্রে বার্গার। বল হাতে রীতিমতো আগুন ঝরিয়েছেন এই পেসার। টস জিতে আগে বোলিং করার সিদ্ধান্তটা যে কতটা কাজে দিয়েছে, সেটা তার কথাতেই স্পষ্ট। বার্গার বলেন, “আগের ম্যাচগুলোতে বড় স্কোর দেখেছি, তাই আগে বল করার সুযোগটা আমাদের জন্য বিশাল একটা ব্যাপার ছিল। সঞ্জু স্যামসনকে ঠিক ওই ডেলিভারিটা করার কোনো পূর্বপরিকল্পনা আমার ছিল না, ওটা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে গেছে। তবে মূল লক্ষ্য ছিল আটসাট বোলিং করে ব্যাটারদের চাপে রাখা।” নতুন কোচ ও অধিনায়কের অধীনে দলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশও বেশ ফুরফুরে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পরিসংখ্যানের দিক থেকেও এই ম্যাচটি রাজস্থানের জন্য রেকর্ড গড়া। তারা ১২৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করেছে মাত্র ১২.১ ওভারে (৪৭ বল বাকি থাকতে)। আইপিএলের ইতিহাসে ১২০ বা তার বেশি রান তাড়া করার ক্ষেত্রে এটি চতুর্থ দ্রুততম জয়, যার আগে রয়েছে কেবল হায়দরাবাদ, পাঞ্জাব ও ডেকান চার্জার্সের কিছু বিধ্বংসী রেকর্ড। আর চেন্নাইয়ের বিপক্ষে বল বাকি থাকার হিসেবে এটি রাজস্থানের সবচেয়ে বড় জয় এবং সিএসকে-র আইপিএল ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম হার। সব মিলিয়ে চেন্নাইয়ের বিপক্ষে এটি রাজস্থানের ১৬তম জয়। সব বিভাগেই এমন অসহায় আত্মসমর্পণের পর আগামী ম্যাচগুলোতে চেন্নাইকে যে নিজেদের অনেক কিছুই ঢেলে সাজাতে হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।