আমাদের এই উপমহাদেশে উৎসব বা পার্বণ মানেই কেনাকাটা, আর সেই আনন্দে পূর্ণতা আনে মানানসই গয়না। বাঙালির গয়নার বাক্সে সোনার পাশাপাশি রুপোর কদরও কিন্তু কোনো অংশে কম না। কাউকে উপহার দেওয়া হোক বা বিপদের দিনের জন্য একটু সঞ্চয়—রুপো বরাবরই আমাদের আটপৌরে জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। নানা ধরনের অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, বাজারের জোগান আর চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এর দাম ওঠানামা করে। তবে বুধবার, ৬ মে ২০২৬-এর বাজারের দিকে তাকালে রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হবে যে কারও। হঠাৎ করেই যেন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে শুরু করেছে দাম।
ভারতীয় বা দেশীয় বাজারের সামগ্রিক চিত্রটা দেখলে চমকে যেতে হয়। বুধবার রুপোর দাম কেজিতে এক ধাক্কায় ৬,০০০ টাকারও বেশি বেড়ে গেছে। হিসেব বলছে, এই মুহূর্তে প্রতি কেজি রুপো কেনাবেচা হচ্ছে প্রায় ২,৬৫,০০০ টাকার আশেপাশে। গ্রাম প্রতি দাম বেড়েছে ১০ টাকার মতো। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই বড় লাফ দেওয়ার ঠিক আগেই, কলকাতার স্থানীয় বাজারে দামের কিছুটা ভিন্ন চিত্র ছিল। ৬ মে-র শুরুতে কলকাতায় খুচরো রুপোর কেজিপ্রতি দাম ছিল ২,৪২,৫০০ টাকা এবং রুপোর বাটের দাম ছিল ২,৪২,৪০০ টাকা। আগের দিনের তুলনায় যা ছিল প্রায় ০.৫৯ শতাংশ বা ১,৪৫০ টাকা কম। ১০০ গ্রামের হিসেবে খুচরো রুপো বিক্রি হয়েছে ২৪,২৫০ টাকায় (১৪৫ টাকা কমে) এবং রুপোর বাট ২৪,২৪০ টাকায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের তুমুল ঝড়ে স্থানীয় বাজারের এই সাময়িক পতন খুব বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি।
রুপোর এই ভেলকির পাশাপাশি সোনার বাজারেও রীতিমতো আগুন লেগেছে। ২৪ ক্যারেট সোনার দাম ১০ গ্রামে ২,০০০ টাকার বেশি বেড়ে গেছে। পিছিয়ে নেই ২২ আর ১৮ ক্যারেটও, সেখানেও বেশ ভালোই দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে যেটা বোঝা যাচ্ছে, বাজারে বুলিয়নের চাহিদা এখন তুঙ্গে এবং সবার মধ্যেই একটা ইতিবাচক মনোভাব কাজ করছে। এই হঠাৎ দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগর হলো আন্তর্জাতিক বাজারের ইশারা। বুধবার বিশ্ববাজারে সোনার দাম ১ শতাংশের বেশি লাফিয়েছে। এর মূল কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে মার্কিন ডলারের দুর্বল হওয়াটা বড় ভূমিকা রেখেছে। ডলারের তেজ কমায় অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী ক্রেতাদের কাছে এই ধাতুগুলো সস্তা মনে হচ্ছে, আর দেশি-বিদেশি সব ক্রেতারাই তাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন কেনার জন্য।
দামের এই ঊর্ধ্বমুখীনতার পেছনে আরেকটা বড় অনুঘটক হলো জ্বালানি তেলের দাম কমে আসা। তেলের বাজার একটু শান্ত হওয়ায় মূল্যস্ফীতি বা দীর্ঘমেয়াদি চড়া সুদের হারের যে জুজুটা অর্থনীতিতে ভয় দেখাচ্ছিল, সেটা বেশ কিছুটা কেটে গেছে। এই স্বস্তিটাই ট্রেডারদের সোনা-রুপোর দিকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে ঝুঁকতে সাহায্য করেছে। এর সাথে সরাসরি যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চালচিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। শুনতে কিছুটা অবাক লাগলেও, এই শান্তির আভাসে ‘সেফ-হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার আকর্ষণ যেন আরও বেড়ে গেছে।
এই পুরো বৈশ্বিক টানাপোড়েনের সরাসরি ফায়দা তুলেছে রুপো। স্পট সিলভারের দামের যে লাফ, তা অন্য অনেক কমোডিটিকেও স্রেফ পেছনে ফেলে দিয়েছে। শুধু সোনা বা রুপোই নয়, বিশ্ববাজারে প্ল্যাটিনাম বা প্যালাডিয়ামের মতো অন্যান্য দামি ধাতুগুলোর দামেও বেশ ভালোই ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বাজার যেদিকে এগোচ্ছে তাতে সাধারণ ক্রেতাদের কপালে হয়তো চিন্তার ভাঁজ পড়বে, তবে লগ্নিকারীদের জন্য এই অস্থিরতা বেশ নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।