দুধ এবং দুগ্ধজাত যেকোনো খাবারই প্রোটিন আর ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ডায়েটে কোন খাবারটা রাখা বেশি উপকারী আর কার জন্য কোনটা উপযুক্ত, তা নিয়ে পুষ্টিবিদদের মধ্যে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। পুষ্টিবিদ সুমন আগরওয়ালের মতে, দুধ থেকে তৈরি হলেও প্রতিটি পণ্যের পুষ্টিগুণ ও হজমের প্রক্রিয়া একেক রকম, তাই সবার জন্য সব খাবার সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে।
যেমন ধরা যাক তরল দুধের কথা। এক গ্লাস বা ২৫০ মিলিলিটার দুধে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন এবং ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। পুষ্টির দিক থেকে এটি দারুণ হলেও অনেকের শরীরেই ল্যাক্টোজ নামক শর্করাটি ঠিকঠাক হজম হতে চায় না, যাকে ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স বলা হয়। ফলে পুষ্টিগুণ থাকা সত্ত্বেও দুধ হজম করা অনেকের জন্য বেশ ঝক্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
হজমের এই দৌড়ে দুধের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে টক দই। যদিও দই ও দুধের পুষ্টিগুণ এবং ক্যালসিয়ামের পরিমাণ প্রায় সমান, কিন্তু ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়ার কারণে শরীর দই থেকে অনেক সহজে ক্যালসিয়াম শুষে নিতে পারে। দইয়ের মধ্যে থাকা ল্যাক্টোব্যাসিলাস নামক উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে পিএইচ (pH) ভারসাম্য বজায় রাখে, যা হজমশক্তি বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করে। আমাদের অঞ্চলে যেহেতু ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্সের সমস্যা বেশ সাধারণ, তাই সরাসরি দুধ যাদের সহ্য হয় না, তাদের জন্য দই একটি আদর্শ বিকল্প।
আবার এই টক দইকে পাতলা করেই তৈরি হয় ঘোল বা ছাস। স্বাভাবিকভাবেই দই বা দুধের তুলনায় এতে প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কিছুটা কমে আসে। ১০০ মিলিলিটার ঘোলে প্রোটিন পাওয়া যায় ৩ থেকে ৩.৫ গ্রামের মতো এবং ২৪৫ মিলিলিটার ঘোলে ফ্যাট থাকে ২-৩ গ্রাম। প্রোটিন কিছুটা কমলেও গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং পেটের ভেতরের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে ঘোলের জুড়ি মেলা ভার।
যারা নিরামিষ বা ভেজিটেরিয়ান ডায়েট অনুসরণ করেন, তাদের জন্য প্রোটিনের অন্যতম প্রধান ভরসা হলো পনির। প্রতি ১০০ গ্রাম পনিরে প্রায় ২১ গ্রাম প্রোটিন এবং ৩৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। পনিরে প্রোটিনের মাত্রা দুধের চেয়ে কম মনে হলেও দইয়ের চেয়ে কিন্তু বেশি। তবে পনির খাওয়ার ক্ষেত্রে একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার, এটি শরীর কর্তৃক আয়রন শোষণের মাত্রা কিছুটা কমিয়ে দেয়, তাই পনিরের পাশাপাশি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াও জরুরি।
অন্যান্য ডেইরি পণ্যের তুলনায় চিজে প্রোটিন এবং ফ্যাট—দুটোর পরিমাণই বেশ চড়া। প্রতি ১০০ গ্রাম চিজে প্রায় ২৫ গ্রাম প্রোটিন ও ৩৪ গ্রাম ফ্যাট থাকে, আর ক্যালসিয়াম থাকে প্রায় ৭৩৯ মিলিগ্রাম। তবে চিজের সোডিয়ামের উপস্থিতির কারণে শরীর খুব সহজে এর ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে পারে না। অবশ্য চিজের সব ধরন এক রকম নয়; পারমেসান বা চেডারের মতো চিজগুলো অন্যগুলোর তুলনায় সহজে হজম করা যায়।
ভোক্তা পর্যায়ে কোন দুগ্ধজাত পণ্যটি সেরা তা নিয়ে যেমন নানামুখী সমীকরণ রয়েছে, ঠিক তেমনি এর পেছনের মূল উৎস অর্থাৎ ডেইরি খামারগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এখন বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। আমরা যখন খাবার টেবিলে বসে প্রোটিনের হিসাব মেলাচ্ছি, তখন বিশ্ববাজারে দুগ্ধ শিল্পের ভেতরের চিত্রটা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
আমেরিকার উইসকনসিন ফার্মার্স ইউনিয়নের গভর্নমেন্ট রিলেশনস ডিরেক্টর মিশেল রামিরেজ-হোয়াইট বিশ্বব্যাপী ডেইরি খাতের এই গভীর সংকট নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ‘ডেইরি টুগেদার’ নামক একটি কৃষক-নেতৃত্বাধীন জোটের মাধ্যমে এই খাতের বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি জানান, ২০১৭ সালের পর থেকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি ডেইরি খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সংকটের মূল কারণ হলো বাজারে দুধের দামের তীব্র ওঠানামা এবং একটানা মন্দা ভাব। বাজারে অতিরিক্ত দুধের সরবরাহের ফলে গত পাঁচ বছর ধরে দুধের দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে ছোট ও মাঝারি আকারের খামারিরা প্রতিনিয়ত বাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন, কারণ বড় বড় কর্পোরেট খামারগুলোর সাথে উৎপাদন খরচের লড়াইয়ে তারা পেরে উঠছেন না।
মিশেল রামিরেজ-হোয়াইটের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ডেইরি শিল্পে বড় কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হবে, যা সামগ্রিক বাজারকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাজারে তরল দুধের সরবরাহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন বা প্রবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরার মতো দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার প্রয়োজন। উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে ডেইরি অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে, যা সাধারণ খামারিদের টিকে থাকার লড়াইকে কিছুটা হলেও সহজ করবে।